Monday, October 21, 2019 4:08 pm
Spread the love

পিরিয়ড বা মাসিকের মত একটা স্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিক বিষয় নিয়ে লজ্জা আর সংকোচের শেষ নেই বাংলাদেশের সমাজে।

গবেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশে নারী স্বাস্থ্য, বিশেষ করে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য এবং পিরিয়ড বা মাসিকের সময়ে পরিচ্ছন্নতা বা নিরাপদ ব্যবস্থাপনা না থাকার কারণে নানা রকম অসুখবিসুখও হচ্ছে।

বাংলাদেশে ২০১৪ সালে সরকার এবং আইসিডিডিআরবি’র চালানো ন্যাশনাল হাইজিন সার্ভেতে বলা হয়েছে, পিরিয়ডের সময়কার পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে প্রায় কোন ধারণাই নাই বেশির ভাগ নারীর।

বাংলাদেশের নারীরা মাসিকের সময় যে দুটো জিনিস মূলত: ব্যবহার করেন তা হচ্ছে পুরনো কাপড় এবং স্যানিটারি ন্যাপকিন।

পুরনো কাপড়

২০১৪ সালের ন্যাশনাল হাইজিন সার্ভেতে দেখা গেছে, বাংলাদেশের শতকরা ৮৬ ভাগ নারী এখনো মাসিকের সময় পুরনো কাপড় বা ন্যাকড়া ব্যবহার করেন।

আইসিডিডিআরবির গবেষক ডা তিশান মাহফুজ জানিয়েছেন, এক্ষেত্রে নারীরা পুরনো শাড়ি, ওড়না বা সুতির কাপড় ব্যবহার করেন।

পিরিয়ডের সময়কার পরিচ্ছন্নতা নিয়ে অনেকেই সচেতন ননপিরিয়ডের সময়কার পরিচ্ছন্নতা নিয়ে অনেকেই সচেতন নন

“এর প্রধান কারণ পুরনো কাপড় সহজলভ্য এবং এজন্য কোন খরচ গুনতে হয় না।”

তবে পুরনো কাপড়ের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে সব সময়ই চিকিৎসক ও গবেষকেরা উদ্বেগ প্রকাশ করে এসেছেন।

পিরিয়ডের সময় কেবল মাত্র পরিচ্ছন্নতা এবং সচেতনতার অভাবে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ডা. তিশান মাহফুজ বলছেন, পরিষ্কার করে ব্যবহার করতে পারলে কাপড় ক্ষতিকর নয়।

স্যানিটারি ন্যাপকিন

খ্রিস্টাব্দ দশম শতকে স্যানিটারি ন্যাপকিনের উদ্ভাবন হয়েছিল বলে জানা যায়।

তবে এখন যে ধরণের স্যানিটারি আমরা দেখি তার প্রথম বিজ্ঞাপন প্রচার হয়েছিল ১৯২১ সালে।

পুনরায় ব্যবহারযোগ্য স্যানিটারি ন্যাপকিনপুনরায় ব্যবহারযোগ্য স্যানিটারি ন্যাপকিন

এই মূহুর্তে বাংলাদেশে মাসিকের সময় নারীরা যে সব জিনিস ব্যবহার করছেন, তার মধ্যে প্যাড অন্যতম জনপ্রিয় পণ্য।

যদিও ন্যাশনাল হাইজিন সার্ভে অনুযায়ী বাংলাদেশে মাত্র ১৪ শতাংশ নারী স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করেন।

এর মধ্যে শহর এলাকায় স্যানিটারি ন্যাপকিন বা প্যাডের ব্যবহার বেশি, সহজলভ্যতাও নগরাঞ্চলে বেশি। আইসিডিডিআরবির গবেষক ডা তিশান মাহফুজ বলছেন,

“স্যানিটারি প্যাড জনপ্রিয় হবার কারণ এর ব্যবস্থাপনা সহজ, কারণ এটা ‘স্যানিটাইজড’ হয়ে আসে। আর এটা জনপ্রিয় করার জন্য বিভিন্ন পর্যায় থেকে সচেতনতামূলক প্রচারণাও চালানো হয়েছে।”

বাংলাদেশে স্যানিটারি প্যাডের বড় অংশটি আমদানি হয় ভারত, চীন এবং থাইল্যান্ড থেকে। এছাড়া স্থানীয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও তৈরি করে প্যাড।

তবে, প্যাডের দাম নিম্ন আয়ের নারীদের ক্রয় সীমার বাইরে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া স্যানিটারি প্যাডে যেহেতু প্লাস্টিক ব্যবহার হয়, সে কারণে এর পরিবেশগত দিক নিয়ে নানা সময় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্যানিটারি প্যাড কোন কোন ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশও প্লাস্টিকের তৈরি হতে পারে। যেকারণে প্লাস্টিক ছাড়া পিরিয়ড পণ্য ব্যবহারের জন্য একটি প্রচারণাও রয়েছে।

স্যানিটারি প্যাড ছাড়া আর যেসব পণ্য বাজারে পাওয়া যায় তার মধ্যে আছে- মেনস্ট্রুয়াল কাপ, টেম্পন, পুনরায় ব্যবহারযোগ্য স্যানিটারি ন্যাপকিন এবং পিরিয়ড প্যান্টি।

মেনস্ট্রুয়াল কাপ

১৯৩৭ সালে মেনস্ট্রুয়াল কাপ উদ্ভাবিত হলেও, এর জনপ্রিয়তা গত কয়েক বছরে বেড়েছে।

এই মূহুর্তে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সরকারিভাবে এটি উৎসাহিত করা হচ্ছে এবং সে অনুযায়ী জনপ্রিয়ও হচ্ছে।

ইংরেজি সি আকৃতির এই সিলিকন কাপ ভাঁজ করে নারীর প্রজনন অঙ্গে প্রবেশ করাতে হয়। এরপর নিজে থেকেই কাপের ভাঁজ খুলে যায় ও সেখানে স্থাপিত হয়ে যায়।

কাপের মধ্যেই জমে ঋতুকালীন রক্ত, যা পরে বের করে দিতে হয়।

ছয় থেকে আট ঘণ্টা পরপর সেই কাপ বের করে পরিষ্কার করে পুনরায় ব্যবহার করা যায়।

চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, একটি কাপ ১০ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়।

মাসিক নিয়ে নানা রকম কুসংস্কার রয়েছে সমাজেমাসিক নিয়ে নানা রকম কুসংস্কার রয়েছে সমাজে

আইসিডিডিআরবির ডা তিশান মাহফুজ বলছেন, বাংলাদেশে সমাজ রক্ষণশীল হওয়ায় এই কাপের ব্যবহার খুবই অনুল্লেখযোগ্য।

টেম্পন

টেম্পনও মেনস্ট্রুয়াল কাপের মত প্রজনন অঙ্গের ভেতরে প্রবেশ করিয়ে দিতে হয়।

মূলত পশ্চিমা দেশে বেশি জনপ্রিয় টেম্পন গত কয়েক বছর যাবত বাংলাদেশেও ব্যবহার হচ্ছে।

তুলা দিয়ে তৈরি টেম্পনের মাথায় একটি সুতার মত, যা নির্দিষ্ট সময় পরে বের করে ফেলতে হয়।

কাপের মত টেম্পনের ব্যবহার নিয়েও বাংলাদেশে অবিবাহিত মেয়েদের মধ্যে নানা রকম সংস্কার রয়েছে, যে কারণে এর ব্যবহার কম।

আইসিডিডিআরবির গবেষক ডা তিশান মাহফুজ বলছেন, “কাপড়ের মত টেম্পনের ক্ষেত্রেও পরিচ্ছন্নতা একটি বড় ইস্যু।

একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এটি পরিবর্তন না করলে নানা রকম ইনফেকশনের আশংকা থাকে।”

পুনরায় ব্যবহারযোগ্য স্যানিটারি ন্যাপকিন

আইসিডিডিআরবিসহ কয়েকটি সংস্থা এখন পুনরায় ব্যবহারযোগ্য স্যানিটারি প্যাড ব্যবহারের কথা বলছে।

মাসিকের ‘লজ্জা’ ভাঙ্গাতে ভ্রমণকন্যাদের চেষ্টা

বিবিসি বাংলায় দেখুন:

পরিবেশের কথা মাথায় রেখে বিশ্বের অনেক দেশেই এখন এটি ব্যবহার হচ্ছে।

স্যানিটারি প্যাডের মত দেখতে জিনিসটির কাপড়ের তৈরি হয় এবং এর নিচে পাতলা একটি প্লাস্টিকের আবরণ থাকে, যার মাধ্যমে ঋতুকালীন রক্ত ছড়িয়ে না পড়ে।

এটি ধুয়ে বারবার ব্যবহার করা যায়, অন্তত এক বছর পর্যন্ত এমন একটি প্যাড ব্যবহার নিরাপদ।

পিরিয়ড প্যান্টি

কারো যদি মাসিকের সময় রক্তক্ষরণ অল্প মাত্রার হয়, তাহলে কাপ বা প্যাডের একটি বিকল্প হতে পারে পিরিয়ড প্যান্টি।

এটি সাধারণ অন্তর্বাসের সঙ্গে বাড়তি কাপড়ের তৈরি হালকা স্তর একটি যুক্ত করা থাকে, যা পরিষ্কার করে পুনরায় ব্যবহার করা যায়।

বাংলাদেশে বিশেষত নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী নারীদের মধ্যে এর ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।

অপুষ্টির কারণে সাধারণত মাসিকের সময় তাদের খুবই অল্প মাত্রায় রক্তক্ষরণ হয় বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য গবেষকেরা।


Spread the love

এই নিউজ পোর্টালের কোনো লেখা কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

আরও পড়ুন